আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ

36

বাবা: হটাৎ গল্প লেখতে ইচ্ছা করলো, পুরোটাই মোবাইলে লেখা, এতো বড় লেখা পড়াটাও খুব কষ্টকর, লিখতে ইচ্ছা করেছে লিখে ফেলেছি, জীবনের ছোট ছোট ইচ্ছা গুলো বাস্তবায়ন করতে সমস্যা কি, আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ  

আমি এই মুহূর্তে একটু একটু দেখতে পাচ্ছি,মনে হচ্ছে শদুয়েক লোক ঘিরে রেখেছে আমাকে। একটু আগে কেও একজন দুচোখে দুটো মরিচ ভেঙে দিয়ে গেছে, খুব জ্বলছিল কিন্তু এখন অনেকটা সহ্য হয়ে গেছে। আচ্ছা মিরাকেল বলেও তো কিছু একটা আছে, এমনোতো হতে পারে শেষ পর্যন্ত কেও একজন ব্যাগটা দিয়ে বলবেন ভাই মাফ করে দিয়েন, আমরা ভুল করেছি। মেয়েটার মুখটা চোখে ভাসছে, এইতো কয়দিন আগেও অফিস থেকে বাড়ি ফিরলে কেমন করে গলা জড়িয়ে ধরে কাধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে যেতো , ‘স’ উচ্চারণ করতে পারতো না মেয়েটা, সবুজ কে ছবুজ বলতো! সেই মেয়েটার বিয়ে আগামী শুক্রবার ভাবতেও কেমন যেনো লাগে আহারে মেয়েটা তো এখন আর শুধু আমার থাকলো না! বিয়ের পর মেয়েটা কানাডাপ্রবাসী হয়ে যাবে, আর জীবনে দেখা হবে কিনা কে জানে! জামাই মাশাল্লাহ্ আচার ব্যাবহার খুব ভদ্র,কানাডার ওন্টারিও তে কাউন্সিলে চাকুরি করে। ছেলেটাও ভালো ছাত্র, এবার গাজীপুরের IUT তে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। এখন তো আমার সুখের সময়।
আচ্ছা এই যে মানুষ গুলো আমাকে মারছে কিন্তু আমি ব্যাথা পাচ্ছি না কেনো! শরীরের অনুভূতি গুলো মনে হয় আর ঠিকমতো কাজ করছে না!
আমার নাম জালালুর রহমান। জীবনের জমানো সবটুকু টাকা ব্যাঙ্ক থেকে উঠিয়ে নিতে আসছি একমাত্র মেয়ের বিয়ে ধুমধাম করে দিবো আর ছেলেকে IUT তে ভর্তি করাবো বলে। ফার্মগেটে DBBL থেকে টাকা তুলে ওভার ব্রীজে উঠেছিলাম ঐ পারে গিয়ে স্কুটার নিবো। হটাৎ একটা লোক এসে ধাক্কা দিলো কিছু বুঝে উঠার আগেই আর একজন ব্যাগ টা নিয়ে দৌর দিলো। আমি পেছনে পেছনে ছিনতাই ছিনতাই বলে দৌরাচ্ছিলাম হটাৎ কিছু লোক এসে বললো কি হইছে! অদ্ভূত ব্যাপার ছিনতাইকারীরা দেখি আমার দিকেই হেটে এসে ঐ লোকগুলো কে বললো এই বুড়া আমাদের ব্যাগ ধরে টানাটানি করছিলো! খুব কড়া করে একটা ধমক দিতে যাবো হটাৎ ঐ ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন লোক আমারে বললো ঐ ব্যাটা দেখলে তো ভদ্রলোক মনে হয় আবার ছিনতাই করছ কেমনে বলেই মুখে ঘুষি দিলো। আমি বুঝতে পারছি এরা একটা চক্র, আগে এদের কথা শুনেছি কিন্তু আজকে আমি নিজেই এদের শিকার! গাল ফেটে রক্ত বের হচ্ছে আমার কিন্তু চোখে ভেসে উঠছে মেয়ের মুখটা আহারে মেয়েটা খুব কাদবে তার বাবার এই অবস্থা দেখে। মেয়েটার বয়স যখন ৮ বছর তখন একবার মোটর সাইকেল এক্সিডেন্ট করেছিলাম, মেয়ের সে যে কি কান্না, ফুপাতে ফুপাতে প্রায় অজ্ঞানই হয়ে যাচ্ছিলো!
হটাৎ কারা জানি বলে উঠলো একটা দিলে হবে নাকি, মার শালারে! বৃষ্টির মতো মার পড়ছে আমার শরীরে! আহারে মেয়েটার বিয়ে কি ভেঙে যায় কিনা যদি ছেলে পক্ষ জেনে যায় মেয়ের বাবা ছিনতাই করতে গিয়ে মার খেয়েছে। আমার চোখ গুলো শুধুই খুজে ফিরছে টাকার ব্যাগ নিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে। কোথাও তো তাকে দেখা যাচ্ছে না! আচ্ছা এই লোকগুলো কেনো আমাকে মারছে আমি ভেবে পাচ্ছি না। এদের সাথে তো আমার কোনো দুশমনি নাই। কেও একজন বললো বুইড়া কেমনে চোখ বড় বড় করে তাকায়ে আছে এর চোখে মরিচ দে। চোখগুলো মনে হচ্ছে গলে বেরিয়ে আসবে, এখন আমার ছেলের চেহারাটা ভাসছে, সেই ছোট বেলা থেকে ছেলেটা চোখের যন্ত্রণায় ভোগে, নিশ্চয়ই আমার বাবু সোনাটাও এমন কষ্ট পেতো চোখ জ্বালা করলে! সেই চার বছর বয়স থেকে ছেলেটাকে চশমা পরতে হয়, আহারে! এখন আর মার গুলো আমার গায়ে লাগছে না, শুধু চোখে ভাসছে লাল টুকটুকে শাড়ি পরা এক কিশোরী মেয়ের মুখ। অদ্ভুত ব্যাপার তো, আমার চোখে ভাসছে আমেনার সেই ১৮ বছর বয়সে আমার বউ হয়ে আসার দিনের চেহারা। কি মিষ্টি দেখতে ছিলো মেয়েটা, তাকালেই বুকটা যেনো কেমন হাহাকার করে উঠতো। এই হাহাকার টাই বোধহয় ভালোবাসা যার রঙ থেকেই হয়তো পৃথিবীর সব রঙ গুলো রঙিন হয়েছে, পৃথিবীর সমস্ত অদ্ভুত রকম কষ্ট আর আনন্দ গুলোও মনে হয় ভালোবাসার আর এক নাম!
আমেনা ছিলো একেবারে সংসারী বাংলার বধূ বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই। বিয়ের পর আমার মসজিদের মোয়াজ্জিন বাবা আর মা একদিন বেড়াতে গিয়েছিলেন। আমি কাজ শেষ করে একটু আগেই বাড়ি গিয়ে দেখি সে আনমনে গুণ গুণ করছে, “জনম জনম তব তরে কাদিবো” আমার চোখ ভিজে গিয়েছিলো সেই অদ্ভুত মায়া ভরা কন্ঠ শুনে। আমেনার গান শুনে এতোটাই অবাক হয়েছিলাম যে তাকেও অবাক করে দেয়ার মতো কিছু করতে মন চাইছিলো। খুব একা একাই গুণ গুণ করেছি কিছুদিন “বধূ তোমার আমার এই যে বিরহ এক জনমের নহে” কিন্তু লজ্জায় শোনানো হয় নাই, আমার গলায় গান টা ঠিক একেবারেই বসে না!
কোনো এক অদ্ভুত সুন্দর মন খারাপ করে দেয়ার মতো দিনে আমেনা বলেছিলো তার খুব শখ কোনো একদিন রিমঝিম বৃষ্টির দিনে আমাকে নিয়ে ঝিলে নেমে শাপলা তুলবে। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম এতো সংসারী একটা মেয়ের ভেতরেও এতো পাগলাটে ধরণের শখ থাকতে পারে! এবার বৃষ্টি হলে ঠিক ঝিলে নামবো আমেনার হাত ধরে শাপলা তুলতে, গলায় সুর নাই তবুও গলা ছেড়ে “বধূ তোমার আমার এই যে বিরহ গান গাইবো”, ছেলেমেয়েরা মুখ লুকিয়ে হাসলেও লজ্জা পাবোনা, মানুষ যদি বলে বুড়ো বয়সে ভিমরতি হয়েছে তাও লজ্জা পাবোনা, একটা ছোট্ট জীবন আমাদের, ছোট ছোট ভালোবাসা গুলো তো প্রকাশ করতে বাধা থাকা উচিত না, অথচ কি এক অজানা লজ্জা আর সংকচে যেনো আমাদের সেই ইচ্ছা গুলো কলিতেই ঝরে যায়।
আচ্ছা সব কিছু মনে হয় কল্পনা, আসলে কিছুই হয় নাই, সব আমার হেলুসিনেশন, তা না হলে আমি এতো পরিস্কার ভাবে সবকিছু ভাবতে পারছি কিভাবে! টাকা গুলো নিয়ে দ্রুত বাড়ি চলে যেতে হবে। এই টাকা গুলো দিয়ে মেয়েটার গয়না গুলো আনতে হবে, কমিউনিটি সেন্টারের ভাড়া খাবার টাকা দিতে হবে, ছেলেটারে ভর্তি করাতে হবে। আমেনা বলেছিলো সব টাকা খরচ করে ফেলোনা, আমাদের ভবিষ্যৎ আছে না! আমি হেসে বলেছিলাম আমার কলিজার টুকরা গুলো তাদের নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছে আর এই সময় আমি টাকা নিয়ে ভাববো, কি যে বলো তুমি, বাবা হিসেবে আমার একটা দায়িত্ব আছে না। আচ্ছা বাবা হিসেবে কি আমি সফল? একদিক থেকে তো সফলই, ছেলেটা ভালো জায়গায় পড়তে যাচ্ছে, মেয়েটার ভালো বিয়ে হচ্ছে। সেদিন অফিসের রানু আপা বলছিলেন আপনি খুব ভাগ্যবান সন্তানের দিক থেকে আর আমার ছেলে টা কোনো কথাই শুনেনা, বাবা মায়ের ভালোবাসাটা বড়ই একতরফা, বাচ্চারা বেয়ারা হয়ে গেলে কিছুই করার থাকে না, তখন মাঝে মাঝে মনে হয় ছেলেটারে বিয়ে দিয়ে দেই, একটা বাচ্চা হলে বুঝবে সন্তানের ভালোবাসা কি জিনিষ।
আসলে ভালোবাসা ব্যাপারটাই কেমন যেনো অদ্ভুত, শুধু নিচের দিকেই গড়ায়, আমরা সব সময়ই নিজের বাবা মায়ের তুলনায় সন্তান কে অনেক বেশি ভালোবাসি! এইটা মনে হয়ে আমার কেমন জানি লজ্জা লাগছে, সন্তানদের নিয়ে এতো ভাবি কিন্তু সেই তুলনায় বাবা মায়ের জন্যে তো কিছুই করি নাই। সম্ভবত পৃথিবীর সব সন্তানই মনে হয় বাবা মায়ের প্রতি অকৃজ্ঞত হওয়ার এক কঠিন শক্তি নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে। আচ্ছা এই লোকগুলো কি আমাকে মেরে ফেলবে! মরে গেলে মনে হয় খারাপ হবে না, বাবা মা এর ঋণ ঐ পারে গিয়ে কিছুটা শোধ করার চেষ্টা করা যাবে, মাঝে মাঝে খুব ক্লান্ত লাগে এই যান্ত্রিক জীবন কে নিয়ে, মায়ের কোলে মাথা রেখে কিছুটা নিশ্চিন্তে ঘুমানো যাবে। কি আশ্চর্য আমি এই সব কি ভাবছি, মরে যাওয়া কি এতোই সহজ! আমার এই মুহূর্তে কিছুতেই মরে যাওয়া চলবে না, আমি একজন বাবা একজন স্বামী, আমার উপর নির্ভর করছে তিনটা মানুষের ভবিষ্যৎ, তাদের সুখ, তাদের স্বপ্ন, সর্বপরি একটা মধ্যবিত্ত সংসারের সুখ দুখের গল্প, আমার মেয়ের বিয়ে দিতে হবে, ছেলেকে ভর্তি করাতে হবে। আমার টাকার ব্যাগ কই, আমি টাকা না নিয়ে যাবোনা, এই ছিনতাই কারি চক্র এখানেই আশেপাশেই আছে, খুজলে অবশ্যই পাওয়া যাবে। লোকগুলো মারতে মারতে ক্লান্ত, এরা এখন চলে যাবে। এইসব মানুষের জীবনে অনেক অশান্তি, সেই অশান্তি গুলো এরা বিনা কারণে রাস্তা ঘাটে সুযোগ পেলে মানুষকে পিটায়ে নিজেকে ঠান্ডা রাখে। হটাৎ মনে হচ্ছে আমার উপর মনে হয় বজ্রপাত হয়েছে, কেও একজন মাথায় সজোরে লাঠি দিয়ে আঘাত করেছে, আমার চোখ টা আবছা আবছা হয়ে আসছে, না আমি কিছুতেই চোখ বন্ধ করবো না, আমার মেয়ের বিয়ে ছেলের ভর্তি, আমি একজন বাবা একজন স্বামী, আমার বেচে থাকতেই হবে, সব কিছু কেমন যেনো ঝাপসা হয়ে আসছে, আমি কি মারা যাচ্ছি, আমার মেয়ের বিয়ে, আমার ছেলের ভর্তি……

Dr. Rony Mustafiz

সিডনি অস্ট্রেলিয়া থেকে