আওয়ামী লীগে মনোনয়নপ্রত্যাশীর ছড়াছড়ি

2

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম ও সাহারা খাতুনসহ পাঁচ সংসদ সদস্যের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে শিগগিরই। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকায় আগামী মাসে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে। এসব আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে ব্যাপক তোড়জোড়।

পাঁচ আসনে উপনির্বাচনে আগ্রহী প্রার্থীদের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে আহ্বান জানানো হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। ২৩ আগস্ট পর্যন্ত আগ্রহীরা মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে পারবেন। ২৪ আগস্ট দলের মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেখানেই প্রার্থী চূড়ান্ত হবে।

গত ১৩ জুন মারা যান সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম। ৯ জুলাই থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সাহারা খাতুন। ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লা মারা যান ৬ মে, পাবনা-৪ আসনের এমপি শামসুর রহমান শরীফ ডিলু ২ এপ্রিল এবং সর্বশেষ গত ২৭ জুলাই মারা যান নওগাঁ-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলম।

শূন্য হওয়া এই পাঁচ আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীর ছড়াছড়ি দেখা দিয়েছে। মনোনয়ন বিতরণের প্রথম তিন দিনে পাঁচ আসনে ৬৬ জন মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। এরমধ্যে সিরাজগঞ্জ-১ আসনে এখন পর্যন্ত ফরম সংগ্রহ করেছেন কেবল একজন। আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, উপনির্বাচনে সাংগঠনিকভাবে দক্ষ, দলের রাজনীতির জন্য প্রার্থী ও তার পরিবারের অবদান এবং অতীতের কর্মকাণ্ড বিবেচনা করেই প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে।

আওয়ামী লীগের নেতারা জানিয়েছেন, সিরাজগঞ্জ-১ ও ঢাকা-৫ আসনে প্রয়াত সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাসিম ও হাবিবুর রহমান মোল্লার পরিবারের সদস্যদের মধ্য থেকেই প্রার্থী দেয়া হবে, এটা মোটামুটি নিশ্চিত। তবে এজন্য শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সাহারা খাতুনের আসনে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের এক নারী নেত্রী এখন পর্যন্ত এগিয়ে আছেন। অন্যদিকে পাবনা-৪ আসনে শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর পরিবার থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী বেশি হওয়ায় পরিবারের বাইরের যে কেউ মনোনয়ন পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শূন্য হওয়া ঢাকা-৫ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের একজন প্রয়াত সংসদ সদস্যের ছেলে ও ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান মোল্লা সজল। এ আসনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত বিকল্প প্রার্থী ছিলেন যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মনিরুল ইসলাম মনু। তিনিও এ উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী। এছাড়া যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনর রশীদ মুন্না, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি কামরুল হাসান রিপন, ডেমরা থানার সভাপতি রফিকুল ইসলাম খান মাসুদ ও আমলিয়া মডেল টাউনের চেয়ারম্যান ব্যবসায়ী আতিকুর রহমান আতিকও এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী। তবে আওয়ামী লীগের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, মশিউর রহমান মোল্লা সজল অথবা মনিরুল ইসলাম মনুর মধ্য থেকে যেকোনো একজন এ আসনে নৌকার টিকিট পেতে পারেন। তবে সজল মোল্লার সম্ভাবনাই বেশি।

ঢাকা-১৮ আসনে প্রয়াত সাহারা খাতুনের ভাইয়ের ছেলে শহীদ সারোয়ার হোসেন মনোনয়নপ্রত্যাশী। একই আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক। তিনি নবম ও দশম জাতীয় সংসদে ঢাকা-১৩ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। ২০০৯ সালে গঠিত মহাজোট সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাননি তিনি। এছাড়া আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমও ঢাকার এ আসনে দলের মনোনয়ন চান। তিনি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাদারীপুর-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। যদিও একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাননি। নানক ও নাছিম ছাড়াও এ আসনে মনোনয়ন চান যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আখতার এবং বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও ব্যবসায়ী নেতা সিদ্দিকুর রহমান। তার জন্য ব্যবসায়ী মহল থেকে তদবিরও করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি নাজিম উদ্দিন ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাবিব হাসানও এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের শীর্ষ এক নেতা বলেন, আমার ধারণা এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ছেলে ও এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম দলীয় মনোনয়ন চাইবেন।

এদিকে ঢাকা-১৮ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মঙ্গলবার রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনায় ওঠে এসেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নাম। যদিও আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানিয়েছে, এটা নিয়ে এখনও কোন আলোচনা হয়নি। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, নির্বাচন আসলেই বঙ্গবন্ধু পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের কারো না কারো নাম আলোচনায় আসে। এবারও সেই আলোচনা হচ্ছে। তবে আমি এখন পর্যন্ত কোথায়ও শুনিনি যে, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল নির্বাচন করতে আগ্রহী।

পাবনা-৪ আসনের প্রার্থীর বিষয়ে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেন, প্রয়াত শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর পরিবারের পাঁচজন সদস্য নির্বাচনে আগ্রহী বলে জানা যাচ্ছে। অতীতে পরিবারের মধ্যে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়েও ঝামেলা হয়েছিল। এমনকি সংঘর্ষও হয়েছে। আর এবার ডিলুর স্ত্রী কামরুন্নাহার শরীফ, মেয়ে মেহজাবিন শিরিন পিয়া, জামাতা ঈশ্বরদী পৌর মেয়র আবুল কালাম আজাদ মিন্টু, ছেলে গালিবুর রহমান শরীফ এবং অন্য ছেলে কনক শরীফ পৃথকভাবে নির্বাচনী প্রচারণাও করছেন। পারিবারিক বিবাদ ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য এ পরিবারের বাইরে থেকে যে কেউ মনোনয়ন পেতে পারেন বলে সূত্রটি জানিয়েছে। এ আসনে সাবেক ডিজিএফআই প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) এএসএম নজরুল ইসলাম রবি, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রবিউল ইসলাম বুদু, পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের উপদপ্তর সম্পাদক সৈয়দ আলী জিরু, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও দুদকের সাবেক কমিশনার সাহাবুদ্দিন চুপ্পুও মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের নেতারা বলেন, অনেকেই নির্বাচন করতে আগ্রহী, দলীয় মনোনয়নের জন্য তত্পরতা শুরু করেছেন। তাদের ভেতর থেকে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা যাকে যোগ্য বিবেচনা করবেন, তিনিই মনোনয়ন পাবেন। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ  বলেন, প্রার্থিতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সব সময়ই মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। এক্ষেত্রেও সেটাই হবে। মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে চূড়ান্ত প্রার্থী বাছাই করা হবে।